ফেসবুকে ভুয়া খবর চেনার উপায়

99
ফেসবুক ফেইক নিউজ

ফেসবুকে ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে! কিন্ত সামাজিক যোগাযোগের এই জনপ্রিয় মাধ্যমে ভুয়া খবরগুলো খুব দ্রুতই ছড়িয়ে যায়। ফলে সেগুলো আর ভার্চুয়াল মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের বাস্তব জীবনে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া কোন ফেইক নিউজ বা গুজব কখনো কখনো বাড়িয়ে দিচ্ছে বাজার দর, আবার কখনো উষ্কে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার পর ফেসবুকে ছড়াচ্ছে একের পর এক ভুয়া খবর। যা আমাদের জন্য প্রায়ই হুমকিস্বরূপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। যদিও এসব ভুয়া খবরগুলোর বেশিরভাগই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আমরাই ছড়িয়ে দিচ্ছি। যার কারণ হিসেবে দেখা যায়, আমাদের দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই ভুয়া খবরগুলো সহজে চিনতে পারেননা। তবে কিছু বিষয় জেনে রাখলে আমরা খুব সহজেই ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া যেকোন ভুয়া খবর / ফেইক নিউজ চিনতে পারব এবং গুজব ঠেকাতে পারব।

‘ভুয়া খবর’ বলতে কি বোঝায়?

ভুয়া খবর চেনার পূর্বে আমাদের জানতে হবে, ‘ভুয়া খবর’ বলতে আসলে কি বোঝায়? ফেইক নিউজ (Fake News) বা ভুয়া খবর হল যেকোন প্রকার মিথ্যা, বানোয়াট খবর কিংবা খবরের বিকৃত রুপ। ভুয়া খবর আমাদের মাঝে ‘গুজব’ হিসেবেও পরিচিত।

ভুয়া খবর কেন ছড়ানো হয়?

আমাদের অনেকেরই প্রশ্ন, ভুয়া খবর আসলে কেন ছড়ানো হয়? যেকোন প্রকার ফেইক নিউজই মূলত অসৎ উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়ে থাকে! যেমনঃ রাজনৈতিক ফেইক নিউজগুলো ছড়ানোর পেছনে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ধর্মীয় উষ্কানিমূলক খবরগুলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য ছড়ানো হয়ে থাকে। আবার অনেক নিউজ পোর্টাল ভুয়া খবর ছাপিয়ে সাইটের ভিজিটর বাড়াতেও এই পন্থা অবলম্বন করে। এরকম একেকটি ফেইক নিউজের পেছনে থাকে একেকটি উদ্দেশ্য।

ফেসবুকে ভুয়া খবর কিভাবে ছড়ায়?

ফেসবুকে ভুয়া খবর ছড়ানো

যেকোন ভুয়া খবর মূলত বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই ছড়িয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফেসবুকই যেকোন গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। ফেসবুকে ভুয়া খবর বিভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। প্রথমে, একটি দুষ্ট চক্র তাঁদের পরিকল্পনা মোতাবেক একটি ভুয়া পোস্ট বা খবর তৈরি করে। আর তা কোন ওয়েবসাইটে অথবা ফেসবুকেই কোন পেজ, গ্রুপ বা ফেইক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করে। সাধারনত, মিথ্যা তথ্যের এসব পোস্ট এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা আমাদের কাছে সত্যই মনে হয়। এরপর চলে বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে ঐসব পোস্ট ছড়িয়ে দেয়ার কাজ। এই কাজেও বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকে এর মূল হোতারা। কখনও, ফেসবুকে অর্থের বিনিময়ে বুস্ট করে, কখনও বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করে আবার কখনও মেসেজ করেও চানিয়ে থাকে ফেইক নিউজ ছড়ানোর এই কাজ। এরপর অন্য সাধারন ফেসবুক ইউজাররা শেয়ার শুরু করলেই হয়ে যায় ভাইরাল! তারপর এসব ভুয়া খবরই চলে যায় জনসাধারণের মুখে মুখে।

যেভাবে চিনবেন ফেসবুকে ছড়ানো ভুয়া খবর / ফেইক নিউজ

  • ভুয়া খবর চেনার প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকারী উপায় হল ওয়েবসাইট অথবা পেজের বিশ্বস্ততা যাচাই। অর্থাৎ, কোন ওয়েবসাইট বা পেজ থেকে আপনি খবর পড়ছেন এটা খেয়াল রাখা সবচেয়ে জরুরী। দেশী এবং আন্তর্জাতিক প্রথম সারির প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার ওয়েবসাইট বা পেজ ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া সংবাদ কোনভাবেই বিশ্বাস করবেন না। কারণ, বেনামী ওয়েবসাইট এবং পেজগুলো থেকেই ভুয়া খবরগুলো ছড়িয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠিত এবং বিশ্বস্ত সকল প্রকার ফেসবুক পেজের নামের পাশে নীল রঙের ভেরিফাইড চিহ্ন থাকে। তাই, কোন মিডিয়ার বিশ্বস্ততা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিও খেয়াল রাখতে পারেন।
  • যেকোন ফেইক নিউজের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আকর্ষণীয় শিরোনাম! অতিমাত্রায় চমকপ্রদ শিরোনামের খবরগুলোর প্রায় সবগুলোই ভুয়া। তাই, এধরনের আকর্ষণীয় হেডলাইনের সংবাদ এড়িয়ে চলুন।
  • ভুয়া ছবি বানাতে ফটোশপের কারসাজি হয়ত আমাদের সবারই জানা। তাই, কোন ছবি সন্দেহ হলে তা বিশ্বস্ত মাধ্যমগুলো থেকে যাচাই করে নিন। কারণ, অনেক সময়ই ফটোশপে ছবি এডিট করেও তা প্রকাশ করা হয়।
  • কোন খবর সন্দেহজনক হলে একাধিক সূত্রে যাচাই করুন। যেমনঃ গুগল সার্চ করে অথবা অন্যান্য দু’একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমের ওয়েবসাইটে গিয়ে ঐ খবরের সত্যতা যাচাই করে নিতে পারেন।
  • আমরা অনেকেই হয়ত সার্কাজম নিউজের সাথে পরিচিত না। বিভিন্ন ওয়েবসাইট আছে, যারা মূলত কৌতুক আকারে খবর বানিয়ে প্রকাশ করে। অনেকেই ঐসব সার্কাজম নিউজগুলোকে সত্য ভেবে শেয়ার করি। তাই, কোন খবর শেয়ারের আগে জেনে নিবেন, খবরটি কোন কৌতুক কিনা!
  • বিভিন্ন জনপ্রিয় এবং প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমের ওয়েবসাইটের মতো হুবহু ওয়েবসাইট বানিয়েও ভুয়া খবর ছড়ানো হয়ে থাকে। তাই, ক্লোন ওয়েবসাইট থেকে সাবধান! এজন্য নিউজ পোর্টালের ডোমেইন বা ঠিকানা ভালভাবে খেয়াল করুন। যেমনঃ বিবিসি বাংলার আসল ওয়েবসাইট ঠিকানা হল www.bbc.com/bengali । কিন্ত কেউ চাইলে www.bbbc.com/bengali ডোমেইন কিনে বিবিসির মতো হুবহু সাইট বানিয়ে পাঠককে বোকা বানাতে পারে।
  • সংবাদ ছাড়াও ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভুয়া তথ্য সম্বলিত পোস্ট শেয়ার করে থাকে অনেকেই। অনেকসময় এসব পোস্ট মেসেজ আকারেও পেয়ে থাকি আমরা। যেগুলোর অধিকাংশই ভুয়া। এসব পোস্টও বিশ্বস্ত মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে নিবেন। এছাড়া, একটু জ্ঞান বুদ্ধি খাটিয়েও এসব তথ্যের সত্যতা আপনি নিজেও যাচাই করতে পারবেন।

সর্বোপরি, ফেসবুকে ভুয়া খবর চেনার সবচেয়ে কার্যকারী উপায় হল, বিশ্বস্ত সূত্র ছাড়া কোন খবর বিশ্বাস না করা। আর খবরের সত্যতা যাচাই ছাড়া কখনই কোন খবর শেয়ার করবেন না। এটা একটা মারাত্মক রকমের ভুল। আর আমাদের এই অসতর্কতার কারণেই, ভুয়া খবরগুলো ছড়িয়ে গিয়ে গুজবে পরিণত হচ্ছে। তাই, আসুন ফেসবুকে ভুয়া খবর যেন না ছড়ায় সে ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি।

আপনার মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামতটি লিখুন
দয়া করে আপনার নামটি লিখুন