যে ৭ কারণে আপনার ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত

126
ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ

বর্তমান বিশ্বে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। এই ভার্চুয়াল নেটওর্য়াকে এখন পর্যন্ত যুক্ত রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২৪০ কোটি মানুষ। ফেসবুক এখন বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েবসাইটও বলা চলে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছে এশিয়া মহাদেশে। যে হারে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে তাতে করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এ সংখ্যা হতে পারে দ্বিগুণ। জনপ্রিয় এই সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মটি বিভিন্নভাবে যেমনি মানুষের, সমাজের, দেশের ও মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখছে। তেমনি এর অপব্যবহারের কারণে অপ্রীতিকর, অনাকাঙ্খিত ও দুঃখজনক ঘটনাও কম নয়।

ফেসবুককে দৈনন্দিন জীবনের একটা অংশ বললেও ভুল হবেনা। আর সেকারণেই আমরা অনেকেই ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করতে চেয়েও পারিনা। আপনি কি ফেসবুক ব্যবহারের ফলে অতিষ্ট? ফেসবুক ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন? তবে আসুন জেনে নিই যেসব কারণে আপনার এখনই ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

১. নৈতিকতার অবক্ষয়

ফেসবুক বর্তমানে আমাদের জীবনের প্রথম পর্যায়ের একটি যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও প্রায়সময়ই আমরা এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছিনা। সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ফেসবুক এখন নেশার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমাদের জীবন এখন প্রায় ভার্চুয়াল জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছে। আমাদের সত্যিকারের সামাজিক সম্পর্ক যেমন বাবা-মা, ভাই-বোন ও বন্ধু বান্ধবদের মাঝে প্রকৃত অর্থে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। আবার অন্যদিকে ফেসবুকের অপঃব্যবহার করে অনেকেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছে। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলাই যায়, দেশের তরুণ সমাজের একটা বিরাট অংশ বিপথে চলে যাচ্ছে ফেসবুকের অপব্যবহারের ফলে। নৈতিকতার অবক্ষয় ঠেকাতে ফেসবুকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রনে আনা অথবা ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

২. লাগামহীন সময় অপচয়

ফেসবুক আসক্তি বর্তমান সময়ে একটা মারাত্নক নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘ডিজিটাল কোকেন‘ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ফেসবুক আমাদের জীবনের বড় একটি সময় কেড়ে নিচ্ছে। বিজনেস ইনসাইডারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে মানুষ গড়ে প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করছে প্রতিদিন ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেট, ছবি আপলোড, চ্যাটিং বা হোমপেজ ব্রাউজিং করতে। ফলে তরুণ প্রজন্ম সৃজনশীল কাজ গুলোতে নিজেদের অংশগ্রহণের চেয়ে ফেসবুকেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। আপনিও যদি আপনার ফেসবুক মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যবহারের লাগাম টানতে ব্যর্থ হোন। তবে তা বন্ধ করে দেয়াই হবে কার্যকারী সমাধান।

৩. বানোয়াট খবর ও গুজবের ছড়াছড়ি

আজকাল ফেসবুকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে প্রায়ই নানা মিথ্যা, বানোয়োট খবর ও গুজব ভাইরাল হতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথোপযুক্ত নজরদারির অভাবে জোরদার প্রতিযোগিতা চলে এসব গুজবের। কখনো নিজের অজান্তেই সেসব গুজব প্রচারের অংশীদার হয়ে যাই আমরা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফেসবুকে গুজবের সূত্র ধরে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও ২০১২ সালের শেষ দিকে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করায় রামু উপজেলার বৌদ্ধবসতি এলাকায় চালানো হয় তান্ডব। শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট চালায় সুযোগসন্ধানীরা। আর বর্তমান সময়ে গুজব ছড়ানোর একমাত্র প্লাটফর্ম ফেসবুকই। তাই, এসব বিভ্রান্তিকর খবরের বিরক্তি থেকে বাঁচতে ফেসবুককে বিদায় জানাতে পারেন।

৪. গোপনীয়তার সংকট

ফেসবুকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিতে অনেক ফিচার থাকলেও। অধিকাংশ ফেসবুক ব্যবহারকারীই সেগুলোর সম্পর্কে জানেনা। ফলে ফেসবুকে আমাদের মাত্রাতিরিক্ত অ্যাক্টিভিটিসের ফলে আমাদের গোপনীয়তা অনেকটাই সংকটের মুখে। ব্যবহারকারী মাঝে মাঝেই নিজের অবস্থান সম্পর্কে স্ট্যাটাস দিয়ে থাকেন। এতে আপনি কখন কী করছেন সব বিষয়েই অন্যরা জেনে যাচ্ছে। অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে জনসম্মুখে নিজেদের ও পরিবারের অতি স্পর্শনীয় ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করছেন। যার ফলে আপনার সম্পর্কে যে কেউ সহজেই অনুমান করতে পারে। তাই ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়কে ব্যক্তিগত রাখতে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

৫. হতাশার সৃষ্টি

যুক্তরাষ্ট্রের উতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের Behavioral Science বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুকে অন্যের সাফল্য বা সুখবর পাওয়ায় নিজের জীবন সম্পর্কে অনেকের মাঝে চরম হতাশার জন্ম হয়। জীবনকে ইতিবাচক ভাবে নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন অনেকে। ফলে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে ও স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও আমাদের ফেসবুকের ভার্চুয়াল জীবনে অবাঞ্চিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। যা আমাদের বাস্তব জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, এসব থেকে দূরে থাকতে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করাই সবচেয়ে ভাল সমাধান হতে পারে।

৬. অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন

বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ফেসবুকে এখন হরেকরকম বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি তাদের তৈরী পণ্য ও সেবা সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ফেসবুকে। বিজ্ঞাপনে পণ্য ও সেবার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের একাংশ তুলে ধরছে, আসল তথ্যগুলো রয়ে যাচ্ছে আড়ালে। ফলে সঠিক তথ্যের অভাবে প্রায়ই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ব্যবহারকারীগণ। মোটকথা, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন আমাদের অনুভূতি গুলোকে প্রভাবিত করছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘অ্যাফেক্টিভ কন্ডিশনিং’ বা ‘আবেগীয় শর্তারোপ’ বলা হয়ে থাকে। তাই বিজ্ঞাপনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে হলে, আমাদের ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

৭. অপরাধ প্রবণতা

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়েছে অপরাধ প্রবণতা। গত বছরের এক হিসাব অনুযায়ী, দেশের অনলাইন ব্যবহারকারী ৭০ শতাংশ নারীই কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছে টিনএজ নারীরা। ব্যক্তিগত মুহূর্তের আপত্তিকর ছবি ও স্পর্শকাতর তথ্য দিয়ে প্রকৃত পরিচয়ের আড়ালে ব্লাকমেইলের শিকার হচ্ছে অনেকেই। তাছাড়া ফেসবুক ব্যবহার করে প্রতিবছর অসাধু মহল অভিনব কায়দায় মেডিকেলসহ বিভিন্ন পাবলিক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করে আসছে। ফেসবুক ফেইক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই মূলত এসব অসাধু কাজ সম্পাদন হচ্ছে। ফলে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে নানা শঙ্কা। তাই এসব অকল্যাণকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে আমাদের ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করাই কি আসল সমাধান?

অবশ্যই না! মাথা ব্যাথায় মাথা কেটে ফেলা মোটেই ভাল সমাধান নয়। ফেসবুক নিঃসন্দেহে এ যুগের অন্যতম সেরা একটি আবিষ্কার। যার ফলে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে আরও দ্রুত ও সহজ। এছাড়াও প্রতিনিয়ত অসংখ্য ভাল কাজ হচ্ছে ফেসবুক প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে। তাই ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করাটা অবশ্যই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, কখন আমাদের ফেসবুক বন্ধ করা উচিত? প্রথমত, আমাদের ফেসবুক ব্যবহারটা আমাদের নিয়ন্ত্রনে থাকা উচিত। ফেসবুকই যেন আমাদের নিয়ন্ত্রন করতে না পারে, এটা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরকেই। কিন্ত এই নিয়ন্ত্রন রাখতে না পারলেই কেবল আমাদের ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়াটাই সবথেকে ভাল সমাধান হতে পারে। নতুবা উক্ত সমস্যাগুলোর মতো ফেসবুকীয় নানা সমস্যা আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।

আপনার মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামতটি লিখুন
দয়া করে আপনার নামটি লিখুন